Showing posts with label প্রেমের গল্প. Show all posts
Showing posts with label প্রেমের গল্প. Show all posts

Saturday, January 11, 2020

প্রেমের গল্প: তুমি যাহা চাও


নিজেকে প্রাণপণে সংযত করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু পারলাম কি? আমার মনের মধ্যে একধরনের হীনম্মন্যতার সৃষ্টি হলো, ভাবলাম আমি বুঝি তার যোগ্য নই, আধুনিক নই, মনের সঙ্গে বিবেকের লড়াই শুরু হয়ে গেল, বিবেক বলছে, কাউকে জোর করে আটকে রেখে কিছুই পাওয়া যায় না, আর মন বলছে, আমিও তো ভালোবাসি, আমারও ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার আছে। এই আত্মদ্বন্দ্বে আমার হৃদয় ক্ষতবিক্ষত হলো। আমি বুঝলাম, আমাকে পালাতে হবে, সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য আমাকে বসতে হবে নিজের মুখোমুখি। জানতে হবে কী চাই আমি, কে সত্য সেটা নয় বরং কোনটা সত্য, সেটাই জানতে হবে, তা যত কঠিন আর যত হৃদয় ভেঙে দেওয়ার মতো নির্মমই হোক না কেন!

বকুল প্রথমে কিছু বলতে না চাইলেও পরে আমার জেরার মুখে স্বীকার করেছে, স্পষ্ট করেই বলেছে, আমি বাড়িতে না থাকলে সে প্রায়ই গাজীপুরের ছায়া–বিথিতে পরাগের বাসায় যায়।

‘কী করো ওইখানে যেয়ে?’

রাগ, দুঃখ, ঈর্ষা আড়াল করে স্বাভাবিক কণ্ঠে জানতে চাইলে বকুল খানিকক্ষণ নীরব থেকে নিচু গলায় বলে,

‘কিছু না। বেশির ভাগ সময় চুপচাপ বসে থাকি। মাঝে মাঝে গল্প করি। পরাগ চাইলে নদীর পাশে, নয়তো শুধু অচেনা কোনো রাস্তা ধরে হাঁটি...’

‘কেন বকুল? কেন যাও ওর কাছে? কেন ওর সঙ্গে সম্পর্ক রাখো? আমার খারাপ লাগে, কষ্ট হয়, বোঝো না তুমি? মনে হয়, তুমি বিশ্বাস ভেঙেছ, প্রতারণা করছ আমার সঙ্গে, আমি মানতে পারি না, কত দিন বলেছি তোমাকে, যেয়ো না...’

বকুল কথা বলে না। মাথা নিচু করে থাকে, হাতের আঙুলে ওড়না পেঁচায়। তার চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি ঝরে পড়ে। বকুলের নিরাভরণ সৌন্দর্যে আবার মুগ্ধ হই আমি, মানুষের কান্নাও এত সুন্দর হয়? দুহাতে ওর কান্নাভেজা উষ্ণ সরল মুখটা তুলে ধরি, ঘরের ভেতর ঝরা বকুলের স্নিগ্ধ সুবাস ছড়িয়ে পড়ে, ব্যাকুল হয়ে বলি, ‘আমাকে ভালোবাসো না তুমি? পরাগকে ভালোবাসো? তাহলে ওকে বিয়ে করলে না কেন, বলো, কেন আমার সঙ্গে জড়ালে?’

‘পরাগ আমার বন্ধু। অন্য কিছু নয়, বলেছি তো তোমাকে, তা ছাড়া...’। বকুল কথা না শেষ করেই ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। নিজেকে হঠাৎ খুব অসহায় আর অস্থির লাগে আমার।

‘ওফ! বকুল! আমি যদি একা একা কোনো মেয়ের বাসায় যাই, তার সঙ্গে হাঁটি, ঘুরে বেড়াই, আর বলি ও আমার বন্ধু, তোমার কেমন লাগবে বলো তো! পারবে সহজভাবে মেনে নিতে? তোমার কি নিজেকে প্রতারিত মনে হবে না?’

বকুলের ঠোঁট কাঁপে, হয়তো কিছু বলার জন্য, কিন্তু কিছুই বলে না সে, আমার প্রশ্নেরও কোনো উত্তর দেয় না। থাক এই মুহূর্তে উত্তর চাই না আমি। ওকে বরং সময় দিই, একা একা ভাবার সুযোগ দিই। ভাবুক, ওর জায়গায় আমাকে কল্পনা করে ভাবতে থাকুক। দেখি কী প্রতিক্রিয়া হয় ওর!

পাশের ঘরে এসে সিগারেট ধরাই, পায়চারি করি। আমি কি তবে নিজের অজান্তেই বকুলের আত্মাকে খাঁচায় বন্দী করেছি? দখল করেছি তাকে? নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছি? তাকে নিজের কেনা সম্পত্তি ভাবছি? বকুলকে দোষী করে নিজে জিততে চাইছি? আর বকুল? ওই বা কী চাইছে? পরাগের সঙ্গে এসব কি কেবল নির্দোষ ভাববিনিময়? নাকি ওর নিঃসঙ্গতা ঘোচানোর নিষ্পাপ চেষ্টা? আমি কি খুব নিষ্ঠুর আচরণ করেছি ওর সঙ্গে? বুঝতে পারি না। ইচ্ছা করে, জগতের সবাইকে শুনিয়ে চিৎকার করে কাঁদি। ইচ্ছা করে, জনে জনে ডেকে নিজের দুর্ভাগ্যের কথা বলি। জিজ্ঞেস করি, এমনটা কি আমার প্রাপ্য ছিল? গভীর এক হতাশা, ক্ষোভ আর সীমাহীন বেদনা আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। এ রকম মনোভাবের সময়ই কি মানুষ তার সবচেয়ে প্রিয়জনকে নিজ হাতে হত্যা করার মতো ভয়ানক সিদ্ধান্ত নেয়? আমিও কি নিজের শিক্ষা-সংস্কৃতি-নীতি-নৈতিকতা বোধ সব ভুলে গিয়ে তেমন ভয়ংকর কিছু করে ফেলব? মনের এই প্রচণ্ড অশান্তি, এই গোপন তাণ্ডব সামাল দিতে গিয়ে বুকের ভেতর একটা অজানা চাপ অনুভব করলাম আমি, তলিয়ে গেলাম শূন্যতার অতল গহ্বরে, তারপর সেখান থেকে সমস্ত শক্তি দিয়ে আবার নিজেকে টেনে তুললাম। আর বুকে পাথর বেঁধে সিদ্ধান্ত নিলাম, আমার যা হয় হোক, হৃদয় ছিন্নভিন্ন হয়ে যাক, জীবন এলোমেলো হয়ে পড়ে থাকুক, কিন্তু বকুল যা চাইবে, তাই হবে, আমি যত দুঃখই পাই না কেন। এই সিদ্ধান্ত নেওয়া খুব সহজ ছিল না, কিন্তু এ ছাড়া আর কীই-বা করার ছিল আমার!

তিন কামরার ছোট্ট বাসার গুমোট নিস্তব্ধতা ভাঙতে গলা উঁচু করে বকুলকে শুনিয়ে বললাম, ‘এক কাপ চা হবে নাকি?’

বকুল এলাচি-দারুচিনি দিয়ে আমার পছন্দের মাসালা চা নিয়ে এলে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলি, ‘পরাগকে একদিন বাসায় ডাকো, চা খেতে খেতে আলাপ করি।’

(আমার প্রতিপক্ষের ধূর্ত চেহারাটা দেখি, তার ব্যক্তিত্ব মাপি, শক্তি আর দুর্বলতা যাচাই করি। দেখি কী জাদু আছে ওর মধ্যে, যা আমার মধ্যে নেই। নিজেকে ওর পাশে দাঁড় করিয়ে দেখি আমরা ঘাটতিটা কোথায়?)

বকুল চমকে উঠে ভীরু হরিণীর মতো চকিত চোখে আমার দিকে তাকায়। ‘কেন?’

‘বাহ্ তোমার বন্ধু তো আমারও বন্ধু, সেই বন্ধুর সঙ্গে পরিচিত হব না? অসুবিধা আছে?’

বকুল অস্ফুট কণ্ঠে বলে, ‘পরাগ কখনোই এখানে আসতে পারবে না।’

ক্রুদ্ধ উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠি আমি, ‘কেন আসতে পারবে না? আসার সাহস নেই বলে, তাই না? ভীরু, কাপুরুষ একটা! আমার মুখোমুখি হতে ভয় পায়? সম্পর্কের দায়িত্ব নিতে ভয় পায়? ডাকো ওকে, বলো তোমাকে নিয়ে যেতে, আমার কোনো আপত্তি নেই। তুমি মুক্ত, যখন ইচ্ছা ওর সঙ্গে চলে যেতে পারো! আমার আর কিচ্ছু বলার নেই।’

একতরফা রায় ঘোষণা করে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলাম না আমি, হাতে ধরা চা–ভর্তি কাপটা একঝটকায় মেঝেতে ছুড়ে ফেললাম। ভেঙে দুই টুকরো হয়ে গেল কাপটা, চা ছড়িয়ে পড়ল মেঝেতে। যেন চায়ের কাপ নয়, আমার সমস্ত অস্তিত্ব, আমার বিশ্বাস, ভরসা আর এত দিনের ভালোবাসা একমুহূর্তে ভেঙে পড়ল। বকুল নিচু হয়ে বসে কাপের ভাঙা টুকরোগুলো একসঙ্গে জড়ো করল। ঘর মোছার কাপড় এনে মেঝেতে পড়ে থাকা চা মুছল। তারপর ভাঙা কাপের টুকরোগুলো একটার সঙ্গে আরেকটাকে লাগিয়ে নিয়ে বিষণ্ন গলায় নিজের মনেই বলল, ‘কী সুন্দর ছিল কাপটা, আর কি জোড়া লাগবে?’

আমি ততক্ষণে ঝড় থেমে যাওয়ার পরের আকাশের মতো শান্ত আর নিশ্চুপ। মাথায় এলোপাতাড়ি কত রকমের চিন্তা আসছে, মনে হচ্ছে যেন একটা প্রচণ্ড ঘূর্ণির তাণ্ডবে সব এলোমেলো হয়ে গেছে। নিজেকে মনে হচ্ছে একটা ধু ধু বালুচর, তৃণহীন, বৃক্ষহীন বিরান ভূমি। বকুল আর আমার মাত্র ছয় মাসের সংসার, এখনো একজন আরেকজনকে ভালোভাবে চিনেই উঠতে পারিনি, আর এরই মধ্যে মিছে হয়ে গেল সব। সব খেলা সাঙ্গ হলো! এ কেমন খেলা? এ কেমন লীলা? বুঝি না। নিজেকে সান্ত্বনা দিই, যা হয়েছে তা ভালোই হয়েছে, যা হচ্ছে তা ভালোই হচ্ছে, যা হবে তা-ও ভালোই হবে। তারপরও বোকার মতো আমি কেন কাঁদছি? কেন নিজেকে এমন সব হারানো মানুষের মতো শূন্য, দীনহীন মনে হচ্ছে? আমি ঠিক করেছি, নিজে গিয়ে সব দাবি ছেড়ে বকুলকে পরাগের বাড়িতে দিয়ে আসব, বকুলের ভালোর জন্য যা যা করা দরকার, তার সব করব।

‘না। ধন্যবাদ। আমার কিসে ভালো, কিসে মন্দ, সেটা না হয় আমাকেই বুঝতে দাও।’

আমি গাড়ি দিয়ে তাকে পৌঁছে দিতে চাইলে শান্ত গলায় বলল বকুল।

আমাকে পেছনে ফেলে বেরিয়ে গেল একাই, যেন ডানা ঝাপটে চোখের সামনে দিয়ে উড়ে চলে গেল একটা সাদা পাখি। নিজেকে মনে হলো স্বনির্মিত কারাগারে বন্দী হয়ে থাকা এক বিধ্বস্ত কয়েদি। কতক্ষণ ছটফট করলাম। বোতল খুলে ব্যাপক মদ্যপান করলাম সিনেমার বিরহী নায়কের মতো, মড়ার মতো পড়ে রইলাম। প্রিয় গানগুলো শোনার চেষ্টা করলাম। নিজের ভেতরের যন্ত্রণার আগুন নিভল না কিছুতেই, বরং দ্বিগুণ পোড়াতে শুরু করল, শুতে পারলাম না সুস্থির হয়ে, ঘুমাতে পারলাম না একটুও, কিছুতেই সামান্যতম শান্তি না পেয়ে শেষ পর্যন্ত ভোরবেলা গাড়ি নিয়ে বের হলাম, উদ্দেশ্যহীন চালাচ্ছি, অনির্দিষ্ট ঠিকানায়, চালাতে চালাতে দেখি আমি কখন যেন উঠে পড়েছি গাজীপুরের রাস্তায়। হ্যাঁ, ছায়া-বিথিতেই যাচ্ছি আমি, যেখানে বকুল যেত সেই পরাগের বাড়িতে।

ছোট্ট জায়গা, একে ওকে জিজ্ঞেস করে নিশ্চয়ই বাড়িটা খুঁজে পাব। সরু গলি, ছোট ছোট দোতলা, তিনতলা বাড়ি, টিনের সেমিপাকা ঘর, ঝাঁকড়া আমগাছ, টং দোকান, নির্জন মাঠ, ডোবা পেরিয়ে গেলাম। সূর্য চনচন করে আলো ছড়ালে রাস্তার পাশে একটা বাঁশের ঝাঁপ দেওয়া চা দোকানের সামনে গাড়ি থামাই, কাঠের নড়বড়ে বেঞ্চে বসে গরুর দুধ দিয়ে বানানো মালাই চা খাই। একটা তিন-চার বছর বয়সী বাচ্চা এসেছে গোল টুপি মাথায় দিয়ে, বাবার সঙ্গে, চুকচুক করে চুমুক দিয়ে দুধ–চা খাচ্ছে। বাবা খুশি খুশি গলায় গল্প করছে পাশের জনের সঙ্গে, ‘এই চা না খাইলে তার চলেই না। ছয় মাস ধইরা পরতেক দিন সকালবেলা অরে এই চায়ের দোকানে নিয়া আসতে হয়।’

আমি চা-পিয়াসী ছোট্ট ছেলেটাকে দেখি, গোলগাল চেহারা, কোমল ত্বক, লাজুক মুখ আর জ্বলজ্বলে দুটি চোখ। আমার তখন মনে পড়ে, এই এলাকায় আমি পরাগের বাড়ি খুঁজতে এসেছি। চায়ের দোকানদারকে জিজ্ঞেস করি, চা–পানরত, দোকানে আড্ডারত, পথে হেঁটে যাওয়া মানুষজনের কাছে জানতে চাই কেউ পরাগকে চেনেন কি না, পরাগের বাড়ি চেনেন কি না? লোকজন মাথা নাড়ে, বয়স্করা পাল্টা জিজ্ঞেস করে, ‘উত্তর ছায়া-বিথি, না দক্ষিণ ছায়া-বিথি? পূর্বপাড়া না পশ্চিমপাড়া? উনার বাপের নাম কী বলেন? কত দিন ধরে এই এলাকায় থাকে? ছাত্র না কর্মজীবী? চাকরি করে না ব্যবসা? নিজের বাড়ি না ভাড়াটিয়া?’

মানুষের এত প্রশ্ন কেন? কেন তারা তাকায় আমার দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে? কেন তারা হাসে, বলে ভালো করে ঠিকানা জেনে নিয়ে আসেন। আমার তখন প্রচণ্ড রোখ চেপে যায়, পরাগের বাড়ি খুঁজে বের করতেই হবে। আমি প্রতিটি বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ি, এটা কি পরাগের বাড়ি? আপনারা কি চেনেন পরাগকে? ছায়া-বিথিতে নয় যেন আমি চক্রাকারে ঘুরছি কোনো অচিন গহ্বরে। ঘুমাতে ঘুমাতে হাঁটছি, ঢুলছি, হাঁটতে হাঁটতে ঘুমাচ্ছি। এই পৃথিবীতে কোথাও কি সে নেই? এই পথে, এই ঘাসে, এই সব কোলাহলে ভরা ছায়া-বিথির বাড়িগুলোতে কেউ কি চেনে না পরাগকে?

‘পরাগ? কোন পরাগের কথা বলছ তুমি, বাবা?’

একটা আধভাঙা প্রাচীরঘেরা পুরোনো বাড়ির শ্যাওলা পড়া উঠানে দাঁড়িয়ে সাদা চুলের এক থুত্থুড়ে বুড়ি জিজ্ঞেস করে আমাকে, ততক্ষণে সন্ধ্যার অন্ধকার ঝুঁকে এসেছে লম্বা নিমগাছের মাথায়। আমি তার কাছাকাছি এসে কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলি, ‘বকুলের বন্ধু পরাগের কথা বলছি আমি, তার বাড়িটা খুঁজছি, বুড়িমা।’

বুড়ি লাঠিতে ঠুকঠুক শব্দ তুলে কাঠের ভারী দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে যায়। তারপর আবার ফিরে আসে, হাতে একটা সাদা–কালো ফটোগ্রাফ। ঝাপসা হয়ে গেছে ছবিটা। অস্পষ্ট বোঝা যায় এক তরুণের ফ্যাকাশে রুগ্​ণ মুখ, মাথায় লতিয়ে থাকা কালো চুল আর তার দুটি করুণ সুন্দর চোখ।

‘এই তো পরাগ।’ বুড়ি বলে, ‘এই পথ ধরে যাও, শিমুলগাছের তলে গভীর অন্ধকারে পরাগের বাড়ি, ওইখানে এক বছর ধরে, একা একা শুয়ে আছে সে। বকুলের বন্ধু পরাগ।’

Saturday, January 4, 2020

প্রেমের গল্প: চেনা লোক অচেনা লোক



কে হ্যাঁয় আজ হাম তুম নাহি
গ্যায়ের কোয়ি...

লোকটা অনেকক্ষণ ধরেই দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার পাশে একটা বাড়ির গেটের সামনে। গেটটা কাঁধসমান উঁচু, ওপরে মধুমালতীর ঝাড়, এখন ফুল নেই কোনো, বরং রাস্তার ধুলায় পাতাগুলো ধূসরিত। সে হয়তো এই সন্ধ্যার আলো নিভে যাওয়া সময়ে বুঝতে পারত না পাতাগুলো তাদের স্বাভাবিক রং হারিয়েছে। পারছে, কারণ তিথি আপার বাসায় যাওয়ার সময়ও এই গেটটাকে দেখেছে সে এবং এই লোকটাকেও, এখানেই।

এমন কি হতে পারে যে এখানেই লোকটার বাসা, সে এই বাড়ির মেজ ছেলে, বাড়িতে সে আর তার বুড়ো মা ছাড়া কেউ থাকে না, বাকি ভাইবোনেরা বিদেশে থাকে, কিংবা অন্য জেলায়, ঢাকা বা চিটাগং। কিন্তু বাইরে থাকা বড়লোকদের বাড়িগুলো আরও সুসজ্জিত থাকে, রাস্তার পাশে হলে পাঁচিল উঁচু করা হয়, নিয়মিত রং করা হয়। এই বাড়িটাকে দেখে মনে হয় না কোনো যত্নের ছাপ আছে। আর লোকটাও তেমনি, একটা হাইনেকের সোয়েটার গায়ে, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, না কামানোর জন্য নাকি এটাই তার স্টাইল—তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না।

সে খানিক দাঁড়ায়, রাস্তার উল্টো পাশ দিয়ে যেতে যেতে থামে, লোকটাকে ভালো করে দেখে। বাসায় ফেরার তাড়া নেই তার। সাজিদ অফিসের কাজে বাইরে গেছে কয়েক দিন আগে, আজও ফিরবে না। রান্নার ঝামেলা নেই, একা থাকলে সে নুডলস দিয়ে ডিনার সেরে নিতে পারে। প্রথম দুবেলা সে তা-ই করেছে, দ্বিতীয় রাত থেকে কিছু আর খায়নি। এখন প্রচণ্ডই খিদে পেয়ে গেছে, এতক্ষণ টের পাচ্ছিল না যদিও।

সামনে দিয়ে হুস করে একটা ময়লার গাড়ি চলে গেল। সে জায়গা থেকে নড়ে না। লোকটাও প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, ডান দিকে তাকিয়ে, ভুরু কুঁচকে। কারও জন্য কি অপেক্ষা করছে? না এমনিতেই, কোনো কাজ নেই বলে?

দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তার মনে হয়, অনেক সময় চলে গেছে; হয়তো এভাবে অনেক দিন ধরেই সে এখানে দাঁড়ানো—এমন অদ্ভুত অনুভূতি হওয়ার কোনো কারণ সে বুঝে পায় না। সে কি তাহলে এই লোকটার জন্য অপেক্ষা করছে? লোকটা তার দিকে একবার তাকালেই সে চলে যেতে পারে, মুক্ত হতে পারে?

রাস্তা পার হয়ে সে মধুমালতীর ঝাড়ওয়ালা গেটের দিকে এগোয়। লোকটা এখনো তাকে দেখেনি। নিজেকে একটু গুছিয়ে নেওয়ার সময় পাওয়া গেল, ভালোই হলো বেশ।

‘এক্সকিউজ মি’ বলবে কি না, ভাবতে ভাবতেই ঘুরে বাঁ দিকে তাকায় হাইনেক সোয়েটার আর খোঁচা খোঁচা দাড়িওয়ালা লোক, বছর পঁয়তিরিশেক হবে বয়স, বেশিও হতে পারে। চেহারাটার যত্ন নিলে হয়তো আরও কম দেখাত।

‘আমি কি আপনাকে চিনি?’ বেমক্কা এই প্রশ্নে লোকটার বিরক্ত হওয়ার কথা ছিল, অন্তত তার চেহারা দেখে মনে হয়েছে যে সে অযথাই বিরক্ত হতে পছন্দ করে; কিন্তু হেসে ফেলে সে।

‘আমি কীভাবে বলব?’

‘না, মানে, আপনি কি আমাকে আগে দেখছেন কোথাও?’

‘মনে পড়তেছে না তো।’

‘আমার আপনাকে চেনা চেনা লাগতেছে তো, সেই জন্যই জিজ্ঞেস করলাম।’

লোকটা আবার হেসে ফেলে। তার হাসিটা বেশ উজ্জ্বল, একেবারেই তার জামাকাপড় আর চেহারার মতন মলিন নয়।

এবার সে-ও হাসে, হেসে বলে, ‘আপনি কি ব্যস্ত?’

‘না তো।’

‘তাহলে চলেন চা খাই।’

হয়তো এবার লোকটা সন্দেহ করতে পারে, বিরক্ত না হলেও। যদিও তাকে দেখে সন্দেহ করার মতন কিছু নেই। একটা সাধারণ শাড়ির ওপর সুতির চাদর পরা, কাঁধে বড় একটা ব্যাগ, ব্যাগে তিথি আপার দেওয়া খাবারের বাক্স। বাক্সে কমলালেবু দিয়ে রান্না করা চিনিগুঁড়া চালের জর্দা। জর্দার কথাটা মনে পড়তেই তার আবার খিদে পেয়ে যায়।

যেতে যেতে একলা পথে
নিভেছে মোর বাতি...

‘চায়ের সঙ্গে আর কিছু খাবেন?’ এমন ভঙ্গিতে প্রশ্নটা করল যেন তাকে কত দিন ধরে চেনে এই লোক।

‘শিঙাড়া খাব, আমার খুব খিদা পাইছে।’

‘আপনারে দেইখাই মনে হইছিল।’ সবজান্তার ভঙ্গিতে কথাটা বলে শিঙাড়া অর্ডার করে, আসার সময় হাতে একটা সিগারেট নিয়ে আসে, ‘স্মোক করলে সমস্যা হবে?’

‘নাহ্। আমার হাজবেন্ড অনেক স্মোক করে, অভ্যাস হয়ে গেছে।’

‘কী করেন আপনার হাজবেন্ড?’ সিগারেট ধরাতে ধরাতে যেন ভদ্রতা করেই প্রশ্নটা করল, জানার আগ্রহ তেমন নেই, থাকার কথাও না হয়তো।

‘আমার বোনের সঙ্গে প্রেম করে।’

সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে আবারও সুন্দর করে হাসে লোকটা, বাচ্চাদের পাকা কথা শুনে কিন্ডারগার্টেনের ভালো মিসরা যেমন হাসে।

‘আপন বোন না, মামাতো বোন।’

‘বড় না ছোট?’

‘অনেক বড়, আমার চেয়ে প্রায় দশ বছরের বড় হবে।’

তিথি আপার বয়স কি আসলেই অত বেশি? দেখে মনে হয় না। আজও বাসায় একটা ছেলেদের হুডওয়ালা পুলওভার আর ফ্লানেলের পাজামা পরে ছিল, দেখে মনে হচ্ছিল সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরোনো যুবতী। কে বলবে তার দশ বছর আগে বিয়ে হয়েছে আর বাচ্চাও আছে দুইটা?

‘নেন, শিঙাড়া খান।’

‘আপনি এইটা খান,’ ব্যাগ থেকে প্লাস্টিকের বাক্স বের করে এগিয়ে দেয় সে।

‘কী এইটা?’

‘আমার বোনের বানানো জর্দা, খুব ভালো রান্না করেন উনি।’

‘আপনি কেমন রান্না করেন?’ জর্দার বাক্স নেওয়ার কোনো আগ্রহ দেখা যায় না।

‘আমিও ভালো রান্না করি।’ কথাটা সত্যি। তার রান্না খেয়ে কেউ কখনো খারাপ বলেনি, সাজিদ তো বলেইনি।

‘তাইলে আপনের জামাই ওনার সঙ্গে প্রেম করবে কেন?’

‘ছেলেরা কি রান্নার জন্য প্রেম করে?’ শিঙাড়া মুখে থাকাতে প্রশ্নটা করতে দেরি হয়ে যায় তার।

‘তাইলে কী জন্য করে?’ লোকটা খুব মজা পাচ্ছে, অপরিচিত এক মেয়ে যেচে কথা বলে আবার নিজের স্বামীর পরকীয়ার গল্প করলে তাকে পাগল ভেবে নিয়ে বিনোদন নেওয়া দোষের কিছু নয়।

‘আপনিই বলেন।’

সিগারেটে আরেকটা টান দিয়ে লোকটা বলে, ‘আপনি গান জানেন?’

‘না তো।’

‘আপনেরে দেইখা মনে হয় জানেন, রবীন্দ্রসংগীত।’

‘তাই নাকি? আর কী মনে হয়?’

লোকটা উত্তর দেয় না, দোকানের ছেলেটার কাছে আরেকটা সিগারেট চায়, আর গুনগুন করে গান ধরে, ‘তুমহে দিল্লাগি ভুল যানি পারেগি, মুহাব্বাত কি রাহো মে আ কার তো দেখো...’

হঠাৎ করেই টিমটিমে ফিলামেন্ট বাতিটা নিভে গিয়ে চারদিক অন্ধকার হয়ে যায়। দোকানটা অন্যান্য দোকান থেকে একটু দূরে। ইচ্ছা করেই এখানে এসেছে তারা, ভিড় কম বলে। অন্য দোকানগুলোর ক্যাটক্যাটে সিএফএল বাতিগুলোও নিভে গেছে। লোড শেডিং।

ডোন্ট ইউ লাভ হার অ্যাজ শি’জ
ওয়াকিং আউট দ্য ডোর? লাইক শি ডিড ওয়ান থাউজ্যান্ড টাইমস বিফোর?

‘দ্যান তো ওইটা, কী জানি খাইতে দিতে চাইছিলেন।’

সে সামনে রাখা বাক্সটা এগিয়ে দেয়। একটা টেবিল তারা দখল করে বসেছে বলে দোকানদারের কোনো দুশ্চিন্তা নেই, এখন পর্যন্ত চার কাপ চা আর তিনটা সিগারেট বিক্রি হয়েছে তার।

দোকানদারের কাছ থেকে চামচ চেয়ে নিয়ে জর্দা মুখে দেওয়ার আগে তার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় লোকটা।

‘আমি খাব না।’

‘কেন খাবেন না? রাগ কইরা? খাওয়ার উপ্রে রাগ করতে নাই।’

তার হঠাৎ চোখে পানি এসে যায়। মা এভাবে বলতেন, ‘খাওয়া হইলো আল্লাহর নিয়ামত, কিসমতে যা জুটছে, তা খাইতে হয়, নাইলে নাফরমানি হয়।’ আম্মা মারা যাওয়ার পর আর কেউ খাবার নিয়ে সাধাসাধি করেনি। ভাগ্যিস বিদ্যুৎ আসেনি, লোকটা দেখতে পাবে না সে কাঁদছে। আর দেখলেই কী? এত কিছু বলে ফেলেছে যখন।

‘ঘি একটু কম হইছে, মিষ্টিও; নেন, খায়া দেখেন।’

নিজেকে সামলে সে জিজ্ঞেস করে, ‘আচ্ছা, আপনি কি বাঙালি?’

‘আমারে দেইখা কি ইংরেজ মনে হয়?’ আবার হাসতে থাকে লোকটা। অথচ মধুমালতীর ঝাড়ওয়ালা গেটের সামনে দাঁড়ানোর সময় তাকে বেশ খিটখিটে মেজাজের বদরাগী লোক বলে মনে হচ্ছিল।

‘না, বিহারি মনে হয়।’

এবারে হো হো করে হেসে ফেলে লোকটা। তার হাসির আওয়াজে দোকানদার পেছন ফিরে তাকায়, তার মুখটাও হাসি হাসি।

হাসিতে যোগ না দিয়ে সে তার আটকে রাখা কান্নাটা ছেড়ে দেয়। প্রসঙ্গ পাল্টে সে মায়ের কথা ভুলে যেতে চাইছিল। আহা রে মা, ভাইয়ের বাড়িতে আশ্রিত থাকা বিধবা মা, ভাইঝিদের ঝি-গিরি করে মেয়ে মানুষ করা মা, আল্লাহভক্ত মা, মানুষে বিশ্বাস রাখা মা। ভালোই হয়েছে, মা নেই, বেঁচে থাকলে কত কষ্ট পেতেন, যখন দেখতেন তাঁর বাপের মতন বড় ভাই, যার মুখের ওপর কোনো কথা কেউ বলতে পারেনি, সেই ভাইয়েরই বড় মেয়ে নিজের প্রেমিকের সঙ্গে তাঁর মেয়ের বিয়ে দিয়ে যেন ফুফাতো বোনের কত বড় উপকার করল—এমন ভঙ্গিতে পরিবারের সবার পিঠ চাপড়ানি নিচ্ছে কতগুলো বছর ধরে, আর সব প্রমাণ নিয়ে গিয়েও তার মুখের ওপর কিছুই বলতে না পেরে তার রান্না খাবার বাক্সে করে নিয়ে এসেছে সেই মেয়ে...ছোট মেয়ে, পরিবারের সবচেয়ে ছোট, সবার ফরমাশ খাটার মতন ছোট, তিথির পুরোনো জামা পরে বড় হয়েছে বলেই কি তিথির পুরোনো প্রেমিকের সঙ্গেই সংসার করতে হবে তাকে? পুরোনোই-বা বলে কী করে? তাদের প্রেম তো এখনো চলছে। অথচ দুলাভাইয়ের সঙ্গেও প্রেমের বিয়েই তিথি আপার...

‘একটা কথা জিজ্ঞেস করি?’

‘করেন’ একটু পর বাসায় গেলেই সব শেষ, সেসব ঠিক করে রেখে এসেছে। বাসার সামনের স্টোরে চার শ টাকা বাকি ছিল, চুকিয়েছে, তিনতলার ভাবি তার বাবার মৃত্যুবার্ষিকীর তেহারি পাঠিয়েছিলেন বড় বাটিতে, খালি খালি ফেরত দেওয়া ভালো দেখায় না আর অত বড় বাটিতে কী দেবে ভেবে পাচ্ছিল না বলে রয়ে গিয়েছিল বাটিটা, ফেরত দিয়েছে সেটা। বাকি ছিল তিথি আপার সঙ্গে দেখা করা, সেটাও করে এসেছে, যদিও কাজ হয়নি, জিজ্ঞেস করতে পারেনি কেন সে এমন করল, কী ক্ষতি করেছিল সে যে এমন প্রতারণা করতে হলো তিথির...আর সাজিদকে তো আগে চিনত না সে, ক্ষতি করার প্রশ্নই নেই।

‘আপনি কেমনে জানলেন ব্যাপারটা?’

সে ব্যাগ থেকে ফোন বের করে অন করে। অন্ধকারে সামান্য আলো যেটুকু বের হয়, তাতে তেমন কিছুই দেখা যায় না, সাজিদের ভুলে ফেলে যাওয়া ফোন। চ্যাটবক্স মুছে রাখেনি, এমনকি কোনো পাসওয়ার্ড পর্যন্ত নেই। এতটাই বেপরোয়া...

এখানে ইন্টারনেট নেই, মেসেজবক্সের এসএমএসগুলো খোলে সে। বুঝতে পারে তার হাত কাঁপছে।

‘এটা আপনার জামাইয়ের ফোন?’

‘হুম,’ এগিয়ে ধরে সে, লোকটা পিছিয়ে যায় যেন একটু।

‘না, না, আমারে দেখানোর দরকার নাই, আমি ভাবতেছিলাম আপনি কোনো কারণে ওনারে ভুল বুঝতেছেন কি না।’

‘ভুল বুঝছিলাম, আগে, এখন ঠিকটা বুঝলাম।’

‘উনি কই?’

‘কে? আমার হাজবেন্ড?’

‘জি।’

‘অফিসের কাজে গেছে, বাইরে—বিদেশ।’

‘আপনে তাইলে বাসায় একাই?’

‘হ্যাঁ।’

‘একা থাইকেন না, মায়ের বাড়ি থাইকা আসেন কিছুদিন।’

‘আমার মা নাই।’ মায়ের বাড়িও তো আসলে তিথিদেরই বাড়ি। উঠে দাঁড়ায় সে।

‘আসি, অনেক ধন্যবাদ।’

কহিব তারে আমার প্রিয়ারে আমারও অধিক ভালোবাসিয়ো...

বাসায় ঢুকে সাজিদের ফোনটা আবার অন করে সে। ওয়াই-ফাই নিজে থেকে কানেক্ট হয়ে চ্যাটবক্স নোটিফিকেশন দিতে থাকে। সে একবার খুলে দেখতে চেয়েও দেখে না। তিন দিনে তারা নিশ্চয়ই যোগাযোগবিচ্ছিন্ন অবস্থায় নেই, তিথি হয়তো জানে ফোনটা তার কাছে, যদিও আজ সারা বিকেলে তার কোনো আচরণেই বোঝা যায়নি সে কথা। খুব স্বাভাবিক, খুব সব সময়ের মতন বাচ্চা নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে বিউটি পারলারে যাওয়ার উপদেশ দিয়ে বাক্সে জর্দা ভরে দিল।

ছোট একটা ব্যাগে দুয়েকটা কাপড়, টুথব্রাশ, চিরুনি আর টুকিটাকি ভরা ছিল। হ্যান্ডব্যাগের ভেতরের ছোট পার্সে রাখা ট্রেনের টিকিটটা ঠিকমতো আছে কি না, দেখে নিয়ে জর্দার বাক্সটা সিঙ্কে রেখে বাসায় তালা আটকায় সে, একবার ভাবে ধুয়ে রেখে যাবে। পরে সিদ্ধান্ত পাল্টায়।

স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে একটা বেঞ্চে বসে অপেক্ষা করে সে। একবার ভাবে, সেই লোকটার ফোন নম্বর থাকলে বেশ হতো, তাকে স্টেশনে আসতে বলা যেত। কেউ বিদায় দিতে না এলে যাত্রাটা কেমন যেন লাগে। পরক্ষণেই মনে হয়, কোন অধিকারেই-বা আসতে বলত তাকে, চেনে না জানে না, অপরিচিত একটা মানুষ। কিন্তু চেনে বলে ভাবত, ভালোবাসাবাসির উদ্দাম রাতগুলোতেও কোনো দিন সন্দেহ হয়নি এই লোকটার মন পড়ে থাকতে পারে অন্য কোথাও।

সে ঠিক করে, এখন থেকে আর সে সাজিদের কথা ভাববেই না। চলে আসার আগে কোনো নোট লিখেও আসেনি সে। কীই-বা লিখত? শুভকামনা? ভালো থাকার আশীর্বাদ? সে কথাও কি আর লিখে জানাতে হবে? যা এত দিন এক ছাদের নিচে থেকে বুঝতে পারেনি সাজিদ, লিখলেই কি পারত?

আধো অন্ধকারে কেউ একজন এগিয়ে আসছে তার দিকে, চোখের কোনা দিয়ে সে দেখেছে। তাকায় না ভালোমতো, চেনা কেউ কি না, সেই লোকটা কি না...অথবা সাজিদই কি না, দেখতেও চায় না সে। একমনে রেললাইনের দিকেই তাকিয়ে থাকে।

Tuesday, December 31, 2019

প্রেমের গল্প: খণ্ডিত চাঁদের ভেতর


এখান থেকে আলতামির দুইটা পথ বেছে নিতে পারে—যেতে পারে ঢাকার দিকে—যে দিকটা সে তিনটা ঘণ্টা আগেও ফেলে আসতে চেয়েছিল। ঢাকা মানেই মৃত্যু হয়ে উঠেছিল আলতামিরের জন্য। শ্বাস নেওয়ার প্রতিটা সময় ছিল ভীতিকর। পেঁয়াজপট্টির ভেতর দিয়ে, মুখের ওপর গামছা চাপিয়ে, পদ্মর হাত ধরে যখন সে ছাড়ছিল কারওয়ান বাজার, মনে মনে খোদার কসম কেটেছিল আলতামির—জান থাকতে আর কোনোদিন ঢাকায় ফিরবে না সে। না, শুধু সে নয়। সে আর পদ্ম।

তা কাজটা তারা কম মন্দ তো করেনি।

সরদারের ডেরায় থেকে, সরদারেরই চোখের আড়ালে তারা প্রেম করেছে। এ যেন পানির ভেতর থেকে কুমিরের সঙ্গে বিবাদ। কিন্তু আলতামিরের এক গোঁ…যে কুমির, তার সঙ্গে বিবাদে ভয় নেই, যদি ডাঙা থাকে পায়ে!

ডাঙা এখন আলতামির আর পদ্ম দুজনেরই পায়ের তলায়। প্রায় ১৭ কিলোমিটার উড়ে এসে এই যে ব্রিজের ওপর উত্তর-দক্ষিণের দুটো পথ…একটা ঢাকা—মৃত্যুর, অন্যটা উন্মুক্ত—জীবনের! তবে তাতেও সন্দেহ হয় আলতামিরের। তার ধূর্ত চোখ বুঝে গেছে ওপাশেও হেডলাইট জ্বেলে দাঁড়িয়ে আছে সরদারের আজ্ঞাবাহী ছায়ারা। সরদার শুধু কারওয়ান বাজারের ওপর যে ছড়ি ঘোরায় তা নয়, বরং তার লোক ছড়িয়ে আছে দশ দিকে। কুলিগিরি করতে গিয়েই তো পদ্মর চোখে মজেছিল আলতামির, কাজল না দেওয়া ডাগর চোখে কী যে হাতছানি! বাজার থেকে কাঁচা সুপারির খদ্দের পদ্ম, প্রতিদিন আলতামিরকে কাছে আসার সুযোগ দিত ভিড়ের মধ্যে। কোনো কোনো দিন যেন তাড়াহুড়ো করেই সন্ধ্যা নেমে যেত। সেদিন...আরও অনেক দিন...একদিন হাত ছুঁয়ে একদিন কাঁধ, আলতামির বুঝেছিল ঢাকার বস্তিঘর ছেড়ে তাকে কোনো জঙ্গলে যেতে হবে। যদি পদ্মর প্রশ্রয় থাকে।

প্রশ্রয় তো ছিলই! না থাকলে সরদারের বউ হয়েও কেন পদ্ম এমন মোহন হাসে? সন্ধ্যার মুখে পটল কেনার নামে পানির ট্যাংকের পেছনে উদ্গ্রীব কেন চলে আসে? আর একাও যে আসে তা তো না…কত আবদার আর খুনসুটি থাকে সঙ্গে!

এক রাতে সরদার যখন বাংলা মদ গিলছিল, তখন আলতামির শক্ত করে ধরে পদ্মর হাত। ঢাকাকে বিদায় দিয়ে পৌঁছাতে চায় জঙ্গলে, ডাঙায়। কিন্তু রাতের এই স্তব্ধ ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে সে গুমগুম শোনে মোটরসাইকেলের শব্দ—দুপাশ থেকেই। উত্তরে ঢাকা—যেখানে কোনোদিন ফিরবে না তারা; আর দক্ষিণে পৃথিবী—যেদিকে কথা ছিল প্রেম আলিঙ্গন করবে তাদের। কিন্তু সরদারের শক্তিবলয় এখন দুপাশ থেকে ইঞ্জিনের শব্দ তুলে অপেক্ষমাণ। তাই দক্ষিণে গিয়েই ফিরে আসতে হয় তাদের, মৃত্যুর মুখ এমন কালো হয় কেন? এরচেয়ে কি ভালো ঢাকার সরদার…ক্ষমাও যদি মিলে যায়! কিন্তু ভালোবাসা নিয়ে ক্ষমাই বা চায় কীভাবে মানুষ?

তাহলে পথ নেই কোনো!

একটা বিন্দুর মতো চাঁদ অনেক নিচের সরু এক সুতানদীতে নিজেকে আছড়ে রেখেছে। আলতামিরের হাসি পায় এই দুর্যোগেও। পথ না থাকলে চাঁদের আলো কোন কাজে আসে? উত্তরে ফেরা যায় না এ আলোয়…দক্ষিণ থেকে হা রে রে রে করে ছুটে আসতে থাকা কালো মৃত্যুর মুখেও এ আলো ভীষণ অকার্যকর!

অথচ দুটো বন্ধ পথকে তীব্রভাবে ভেঙিয়ে পদ্ম আর আলতামির পরস্পরকে প্রবলভাবে জড়িয়ে ধরতেই তাদের মধ্য থেকে বেরিয়ে আসে তৃতীয় পথ। চাঁদ তাদের সাহায্য করে হয়তো। অথবা কবেকার শোনা পালাগান, আরব্য রজনী বা পাখিরা হয়তো তাদের মাথার ভেতর ডেকে ওঠে হঠাৎ করেই। তারা দুজন দুজনাকে ধরে তৃতীয় অতিকায় এক পথ সৃষ্টি করে লাফিয়ে পড়ে ব্রিজ থেকে।

তারা পাখি নয় বলে উড়ে যেতে পারে না। তারা মায়াবী নয় বলে মিলিয়ে যেতে পারে না বাতাসে। তবে অনেক নিচের চাঁদকে তারা দ্বিখণ্ডিত করে ফেলে। লোকে বলে, ভালোবেসে এর আগেও অনেকেই চাঁদকে এমন দ্বিখণ্ডিত করে গেছে!